বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা
ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় :
০৬-১১-২০২৬ ১২:২৭:২৮ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
০৬-১১-২০২৬ ১২:২৭:২৮ অপরাহ্ন
ফাইল ছবি
বিশ্ববাজারে আবারও চাহিদার তুলনায় তেলের সরবরাহ বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তেলের দাম বেশি থাকায় চাহিদা কমে যাওয়াই এর প্রধান কারণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষক ও ব্যবসায়ীরা।
তবে ইরান যুদ্ধের এখনো কোনো সমাধান হয়নি। গত মার্চ থেকে এই যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানি ব্যাহত হচ্ছে।
রয়টার্স জানায়, ২০২৬ সালের শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল, বিশ্ববাজারে তেলের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি থাকবে। কিন্তু ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) এই পরিস্থিতিকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তেল সরবরাহ সংকট বলে উল্লেখ করে। যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানি কমে যায়। ফলে বাজারে তেলের সরবরাহ উদ্বৃত্ত থাকার আগের পূর্বাভাসও পাল্টে যায়।
তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ২০২৬ সালে বিশ্বজুড়ে এর চাহিদা নিয়ে পূর্বাভাস কমিয়েছে বিভিন্ন ব্যাংক ও সরকারি সংস্থা।
অন্যদিকে তেলের সরবরাহ আবার বাড়তে শুরু করেছে। সরবরাহ বাড়া এবং চাহিদা কমে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের ঘাটতি কাটতে শুরু করেছে। জেপি মরগানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ বাড়ছে। একই সঙ্গে অন্যান্য দেশেও উৎপাদন বেড়েছে। অন্যদিকে চাহিদা কম থাকায় বিশ্ববাজারে আবারও সরবরাহের তুলনায় চাহিদা কমে গেছে।
ব্যাংকটির হিসাব অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে বিশ্ববাজারে প্রতিদিন ১১ লাখ ব্যারেল তেল উদ্বৃত্ত ছিল। অক্টোবরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৪ লাখ ব্যারেলে। গত বছর প্রতিদিন গড়ে ১৩ লাখ ব্যারেল তেল উদ্বৃত্ত ছিল। অর্থাৎ, চলতি বছরের অক্টোবরে তেলের উদ্বৃত্ত গত বছরের গড় পরিমাণকেও ছাড়িয়ে গেছে। জেপি মরগান আরো জানিয়েছে, অক্টোবরে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের আমদানি বেড়ে ২০২৫ সালের গড় পরিমাণকেও ছাড়িয়ে গেছে। তবে তেলের চাহিদা এখনো সরবরাহের তুলনায় কম।
ইরান যুদ্ধের কারণে শিল্পোন্নত দেশগুলোর নিজস্ব মজুত থেকে রেকর্ড পরিমাণ তেল বাজারে ছাড়ার উদ্যোগ নেয় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা। একই সময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক তেলের মজুতও কমে যায়। তবে গোল্ডম্যান স্যাকসের হিসাব বলছে, যুদ্ধ শুরুর পর কয়েক মাসে বিশ্বজুড়ে তেলের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমলেও সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে তা আর কমেনি। ব্যাংকটির মতে, চলতি বছরের মার্চে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহে ঘাটতি ছিল। তবে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে সরবরাহ ও চাহিদা প্রায় সমান ছিল। গত বছরের সামান্য উদ্বৃত্ত, উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরে বিভিন্ন দেশে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং তেলের চাহিদা কমে যাওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
জেপি মরগান ও গোল্ডম্যান স্যাকস—দুটি ব্যাংকই জানিয়েছে, যুদ্ধের শুরুর কয়েক মাসের তুলনায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ বেড়েছে। তবে সেপ্টেম্বরে সরবরাহ যে পর্যায়ে ছিল, অক্টোবরে তা কিছুটা কমেছে। যুদ্ধ শুরুর পর সেপ্টেম্বরে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সবচেয়ে বেশি তেল সরবরাহ করা হয়েছিল। জাহাজ চলাচলের তথ্য পর্যবেক্ষণকারী দুটি প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, আরো চালানের তথ্য পাওয়া গেলে অক্টোবরে সরবরাহের হিসাব বাড়তে পারে।
জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ভর্টেক্সার তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে প্রতিদিন গড়ে ১ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও কনডেনসেট (প্রাকৃতিক গ্যাসের সাথে গ্যাসক্ষেত্র থেকে উঠে আসা এক ধরণের প্রাকৃতিক তরল খনিজ তেল) রপ্তানি হয়েছে। যুদ্ধের আগের সময়ের তুলনায় এই পরিমাণ প্রায় ৮৬ শতাংশ। অন্যদিকে, পরিশোধিত জ্বালানি তেল রপ্তানি হয়েছে প্রতিদিন গড়ে ৩১ লাখ ব্যারেল। এই পরিমাণ যুদ্ধের আগের স্বাভাবিক সময়ের অর্ধেকের সামান্য বেশি।
বিশ্ববাজারে স্বল্পমেয়াদে তেলের সরবরাহ চাহিদার চেয়ে বেশি থাকার আরেকটি লক্ষণ দেখা যাচ্ছে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের বিভিন্ন সময়ের সরবরাহ চুক্তির দামে। এসব চুক্তির দাম বিশ্লেষণ করে বাজারের পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এর মধ্যে ‘কন্ট্রাক্টস ফর ডিফারেন্স’ নামে এক ধরনের চুক্তিও রয়েছে। লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ গ্রুপের (এলএসইজি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহে সরবরাহের জন্য ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের চুক্তির দাম পরের সপ্তাহের চুক্তির চেয়ে কম। গত জুলাইয়ের পর এই দুই চুক্তির দামের ব্যবধান এখন সবচেয়ে বেশি। একইভাবে দ্বিতীয় ও তৃতীয় সপ্তাহের সরবরাহ চুক্তির দামও পরের সপ্তাহের চুক্তির তুলনায় কম।
বাজারের এই অবস্থাকে বলা হয় ‘কনট্যাঙ্গো’। সাধারণত এর অর্থ, তাৎক্ষণিকভাবে সরবরাহের জন্য বাজারে পর্যাপ্ত তেল রয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে সরবরাহের জন্য ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের চুক্তিগুলো এখনো ‘ব্যাকওয়ার্ডেশন’ অবস্থায় রয়েছে। ব্যাকওয়ার্ডেশন অবস্থা বলতে বোঝায় কোনো পণ্য ভবিষ্যতে কেনার চেয়ে আজ নগদ দামে কেনা বেশি ব্যয়বহুল। এ অবস্থায় ভবিষ্যতে সরবরাহের চেয়ে দ্রুত সরবরাহের তেলের দাম বেশি থাকে। অর্থাৎ, বাজারে এখন তেলের সরবরাহ যথেষ্ট থাকলেও ভবিষ্যতে সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
অভিজ্ঞ তেল ব্যবসায়ী ও বাজার বিশ্লেষক আদি ইমসিরোভিচ বলেন, অদলবদল চুক্তিতে কনট্যাঙ্গো পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ব্রেন্ট তেলের ভবিষ্যৎ সরবরাহের চুক্তিতেও একই অবস্থা তৈরি হতে পারে। কারণ, সাধারণত বাস্তবে তেল কেনাবেচার বাজার থেকেই এ ধরনের পরিবর্তনের শুরু হয়।
বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স